×
  • প্রকাশিত : ২০২৩-১০-২৯
  • ৩৩০ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে ডলার সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।  সরকার দ্রুত গতিতে ডলার সংকট মোকাবেলায় বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। অপচয়মূলক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার আমদানি, পণ্য রফতানি ও রেমিটেন্স বৃদ্ধি করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়। দ্রুততার সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন কিছু নীতিমালাও প্রণয়ন করে। এমন অবস্থায় ডলারের ওপর চাপ কমাতে সরাসরি টাকা ও রুপির মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা-দিল্লি। মার্কিন ডলারের পাশাপাশি বাংলাদেশি মুদ্রা টাকা ও ভারতীয় মুদ্রা রুপিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য শুরু করা এখন সময়ের ব্যাপার। আগামী সেপ্টেম্বরে টাকা-রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু করার লক্ষ্যে কাজ করছে দুই দেশ।

নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের এই উদ্যোগ এক দশক আগেই নেয়া হয়েছিল। সে সময় নানা ঝুঁকি বিবেচনায় প্রস্তাবটি আর আলোর মুখ দেখেনি। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেন করার প্রস্তাব ওঠে। মার্চে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। এ বিষয়ে আলোচনা করতে গত ১১ই এপ্রিল বাংলাদেশে সফরে আসে ভারতের একটি প্রতিনিধি দল। তারা বাংলাদেশের ব্যাংকারদের সাথে বৈঠক করে টাকা ও রুপিতে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে প্রাথমিকভাবে চারটি ব্যাংকের মাধ্যমে এই লেনদেন চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে - বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক এবং ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও আইসিআইসিআই। এ বিষয়ে রাজি হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংক ও ইষ্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডকে (ইবিএল) ভারতের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও আইসিআইসিআই ব্যাংকে রুপিতে নস্ট্রো-অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমোদন দিয়েছে। নস্ট্রো-অ্যাকাউন্ট মানে হলো বাংলাদেশের কোন ব্যাংকের বিদেশী ব্যাংকে খোলা একাউন্ট যা বৈদেশিক মুদ্রায় বাণিজ্য ও লেনদেন সহজ করে। এই দুই ব্যাংকে খোলা নষ্ট্রো-অ্যাকাউন্টে শুধুমাত্র (ভারতে) রপ্তানির বিপরীতে রুপিতে অর্জিত আয় জমা করা যাবে। জমা হওয়া অর্থে শুধুমাত্র ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য ও সেবার ব্যয় মেটানো যাবে। এছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে আগাম পরিশোধ করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত গাইডলাইন মেনে এসব অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ওভার ড্রাফট ও স্বল্প মেয়াদি ঋণও নেওয়া যাবে।

গত মার্চে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ-প্রতিমন্ত্রী ভাগবত কৃষ্ণরাও করাদ রাজ্যসভায় জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ১৮টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য রুপির মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করেছে আরবিআই। মালয়েশিয়ার সঙ্গে এই ব্যবস্থা এরমধ্যেই চালুও হয়েছে। ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে রুপির কদর বাড়াতে চায়। এজন্য শুধু বাংলাদেশ নয়, রাশিয়াসহ অন্য অনেক দেশের সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছে দেশটি।

বাংলাদেশি নাগরিকরা ভারতে চিকিৎসা, পর্যটন ও কেনাকাটা বাবদ প্রচুর ব্যয় করেন। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মোট আমদানির ১৪ শতাংশ হয় ভারত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানি করেছে এক হাজার ৬১৯ কোটি ডলারের। ঘাটতির পরিমাণ এক হাজার ৪১৯ কোটি ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাংলাদেশের হাতে যেহেতু যথেষ্ট পরিমাণ রুপি নেই, এ কারণে দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেন করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ২০০ কোটি ডলারের যে রপ্তানি আয় বাংলাদেশ করছে, সে পরিমাণ বাণিজ্য ভারতীয় মুদ্রায় করার কথা ভাবা হচ্ছে। এর বেশি পণ্য রুপিতে কেনা যাবে না, কারণ রফতানি ছাড়া রুপি পাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে বাংলাদেশকে আমদানি মূল্যের বাকি অংশ অর্থাৎ ১৪শ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় আগের মতোই মার্কিন ডলারে পরিশোধ করতে হবে। রুপিতে লেনদেনের ফলে বাংলাদেশের যে ২০০ কোটি ডলার বেঁচে যাবে সেটা দিয়ে সরকার অন্য দেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ-ভারত চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমদ। তার মতে, এতে উভয় দেশই লাভবান হবে। বাণিজ্য ২০০ কোটিতে বেঁধে দেয়ায় কোন ঝুঁকিও থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হকের দাবি, এই লেনদেন যেহেতু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে হবে সে কারণে বার বার মুদ্রা রূপান্তর করার খরচ কমবে। বিনিময় মূল্যে আমরা সাশ্রয় করতে পারবো।

আবার বাংলাদেশ থেকে ভারতে নিয়মিত ভ্রমণকারীরাও একে লাভজনক উপায় বলে মনে করছেন। বাংলাদেশ থেকে কেউ যদি ভারতে ভ্রমণে যান তাহলে তার পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করতে হয়। সেই ডলার ভারতে গিয়ে রুপিতে ভাঙিয়ে খরচ করতে হয়। দুবার মুদ্রা বিনিময়ের কারণে লোকসানে পড়ার কথা জানান ভ্রমণকারীরা। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৬ টাকা থেকে ১১০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। সে হিসেবে ১০০ ডলার কিনতে খরচ পড়ছে ১০ হাজার ছয়শ থেকে ১১ হাজার টাকার মতো। এই ১০০ ডলারের বিনিময়ে ভারতীয় রুপি পাওয়া যায় আট হাজার দুইশ থেকে আট হাজার তিনশর মতো। কিন্তু এই লেনদেন যদি সরাসরি টাকা ও রুপিতে হতো তাহলে একই পরিমাণ টাকায় ভারতীয় রুপি পাওয়া যেতো ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ১৪ হাজারের মতো। বেশ বড় অংকের ফারাক।

বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রথমে কোভিড ও পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ডলার-সংকট দেখা দেয়, যা এখনো চলমান। এর ওপর আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতি সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এরই মধ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক লেনদেনে বাংলাদেশি টাকা ও তাদের রুপি ব্যবহারের মৌখিক প্রস্তাব দেয়। পরে দ্রুততার সাথেই দুই দেশ উদ্যোগ নেয় কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থার।  রাশিয়া, চীন, ভারতসবাই আস্তে আস্তে ডলার থেকে সরে যাওয়ার চিন্তা করছে। আমাদেরও ডলারের বিকল্প ভাবতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের ২০০ কোটি ডলারের রপ্তানির সমান অর্থ রুপি দিয়েও শুরু করা যায়, খারাপ কী? আমরা উদ্যোগটিকে স্বাগত জানাচ্ছি, এমন উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব ডলার সংকট সমাধান করে অর্থনীতির চাকা গতিশীল করা।

লেখক- হাসান ইবনে হামিদ 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat