×
  • প্রকাশিত : ২০২১-১১-২৬
  • ৯৪৮ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বিগত কয়েকদিন বাংলাদেশ এমন কিছু দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে যা কখনো মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম চিন্তাই করতে পারেনি। যে দেশ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত, যে দেশের ওপর দিয়ে ভয়াবহ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে, যে দেশ চার লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই দেশেই কিনা একদল জনগোষ্ঠী গণহত্যাকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছে। এই সেই পাকিস্তান যে পাকিস্তান মাত্র ৫০ বছর আগে এই বাংলাদেশে বর্বর গণহত্যা সংঘটিত করেছিলো, এই সেই পাকিস্তান যারা কিনা মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে এর মধ্যে স্বল্পতম সময়ে সংখ্যার দিকে সর্ববৃহৎ গণহত্যা এই বাংলাদেশে সংঘটিত করেছিলো, মাত্র নয় মাসে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৬,০০০ ১২,০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে যা গণহত্যার ইতিহাসে প্রতিদিনে সর্ব্বোচ্চ নিধনের হার। অথচ বিজয় মাসের দ্বারপ্রান্তে এসে আমরা কিনা দেখলাম মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামকে মিনি পাকিস্তান হয়ে যেতে! বাংলাদেশের নাগরিকদের একটা অংশকে দেখলাম পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান দিতে, মুখে পাকিস্তানী পতাকা এঁকে, হাতে বড় পতাকা নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে! এতে আমরা অবাকই হয়নি বরং ক্ষুব্ধ হয়েছি। আমরা এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে তাই চুপ না থেকে সবাই সবার জায়গা থেকে আওয়াজ তুলছি।

বাংলাদেশে থাকা পাকিস্তানের এই সমর্থকগোষ্ঠী কিন্তু আটকে পরা পাকিস্তানী না, তারা কিন্তু এই দেশের আলো বাতাসে বড় হওয়া, এই দেশের নাগরিক পরিচয় দেয়া মানুষ! এই সমর্থকগোষ্ঠী স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে এতো বড় ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস কিভাবে হয়েছে তা আলোচনার দাবি রাখে। তারা হাসিমুখে মিডিয়াতে বক্তব্যও দিচ্ছে, তারা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা কেনো হলো সেটা নিয়ে আক্ষেপ দেখাচ্ছে! এমন বক্তব্য আমরা গণমাধ্যমে দেখে স্তম্ভিত হয়েছি, রাগে ক্ষোভে ফুঁসেছি। কিন্তু এর সমাধান আমাদের অবশ্যই বের করতে হবে। আমরা জনগণ এতে সচেতন হলেই চলবে না, সরকারকেও এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ বাংলাদেশে পাকিস্তান প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকা প্রজন্মের চাইতেও বড় একটি প্রজন্ম আছে যারা বাংলাদেশকে বুকে লালন করে। আর সেই গোষ্ঠী যদি তাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে তবে কিন্তু তাদের অস্তিত্ব বিলীন হতে বাধ্য। কিন্তু আমরা চাইনা এমন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটুক। বরং সরকার এ ব্যাপারে খুব দ্রুত যেন পদক্ষেপ নেয় সেটাই আমাদের কাম্য।

পাকিস্তান দল যখন বাংলাদেশের মাটিতে এসেছে তখন অনেকের আবেগ বা উল্লাস আমরা লক্ষ্য করেছি। এসব দেখে আমরা অনেকেই হয়তো চুপ ছিলাম, অনেকেই ভেবেছি পাকিস্তান বিশ্বকাপে ভাল করাতে হয়তো অনেকেই প্রশংসা করছে। কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে পাকিস্তানের পতাকা হাতে স্টেডিয়ামে যখন বাংলাদেশের নাগরিকদের দেখলাম তখন তা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। এখানে কয়েকটি বিষয় শুরুতেই আসবে আর তা হলো, পাকিস্তান টিম যখন বাংলাদেশে আসলো তারা মিরপুরে প্র্যাক্টিস শুরু করলো তখনই দেখলাম পুরো মিরপুর স্টেডিয়াম জুড়ে তাদের দেশের পতাকা ঝুলিয়ে দেয়া হলো। এটা সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত এবং বাংলাদেশকে তথা বাংলাদেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোপ্রত্যকে দেশের একটা আইন থাকে, তেমনি আমাদের আইনে স্পষ্টভাবেই আছে অন্যদেশের পতাকা টাঙালে অনুমতি নিতে হয় এবং সেই আইন মেনে আমাদের দেশের পতাকাও রেখে তারপর ভিনদেশের পতাকা উড়াতে হয়। কিন্তু পাকিস্তান নিয়মের কোন তোয়াক্কা না করে, অনুমতি না নিয়ে স্টেডিয়াম জুড়ে গণহত্যাকারী সেই রাষ্ট্রের পতাকা টাঙিয়ে দিলো। তড়িৎ গতিতে যে একশনে যাবার দরকার ছিলো সরকার সেই একশনে না গিয়ে নমনীয় ভাব পোষণ করেছে। কিন্তু কেন? কেনইবা প্রথম দিনের ঘটনার পর যখন গণমাধ্যমে এটা নিয়ে আলোচনা শুরু হল বিসিবি পাকিস্তান ম্যানেজম্যান্টকে প্রশ্ন করেনি? কেন শাস্তির বিধান রাখা হয়নি? কেন পুরো দলকে আইন ভঙ্গের অভিযোগে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের সমাধান সরকারকে খুঁজতে হবে এবং খোঁজা উচতি। এমন নমনীয় ভাবের পর আমরা দেখলাম স্টেডিয়ামে ওপেন পাকিস্তানের পতাকা, মিরপুরকে মনে হচ্ছিলো পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ স্টেডিয়াম। তাই আমরা চাই এই সমর্থক গোষ্ঠীর বেলায় যেনো সরকার আগের মতো নমনীয় ভাব পোষণ না করে। আমরা চাই, এই সমর্থকগোষ্ঠীর বিচার, আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যথাযথ উপায়ে বিচার। তাই গণহত্যাকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানের সমর্থনকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করে আইন চাই। ভবিষ্যতে এমন কাজ করার কল্পনাও যেনো কেউ না করতে পারে সেজন্য পাকাপোক্তভাবে একটি শক্ত আইন আমরা দেখতে চাই। আজ যদি এই সমর্থকগোষ্ঠীকে বিচারের আওতায় না আনা যায় ভবিষ্যতে এই সমর্থন যে আরো বাড়বে তা কিন্তু স্পষ্ট।

খেলার সাথে রাজনীতি মেশাই না, খেলা খেলাই, খেলা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এসব যুক্তি অনেকেই ফেসবুকে দিয়ে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্যে দু এক কথা। খেলার সাথে কেউ আপনাকে বলছে না রাজনীতি মেশাতে বরং কোনটা রাজনীতি আর কোনটা গণহত্যা, কোনটা নিজের জন্মপরিচয় তা আগে জানুন, বুঝুন। পাকিস্তান আমাদের জন্ম পরিচয় আমাদের অস্তিত্ব সবকিছুকে শেষ করে দিতে চেয়েছে, আমাদের ওপর বর্বর গণহত্যা চালিয়েছে, আমাদের মা বোনদের ধরে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে! যারা বড় মুখে বলছেন খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না, তারা কি এই ধর্ষণ, নির্যাত্‌ন, হত্যা সর্বোপরি গণহত্যাকে রাজনীতি বলছেন? রাজনীতির সংজ্ঞা কি আসলে তাই বলে? ভাবুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন। যাঁদের কারণে একটা জন্মপরিচয় মিলেছে, একটা আইডেন্টিটি পেয়েছেন তাদেরকে অস্বীকার করে পাকিস্তানকে সমর্থনের জন্য এই যে খেলার সাথে রাজনীতি মেশাই না বক্তব্য দিচ্ছেন তা কতোটুকু যৌক্তিক! বুঝতে চেষ্টা করুন রাজনীতি কাকে বলে আর মানুষ হত্যা, নারী নির্যাতন কাকে বলে! পাকিস্তানকে সমর্থনের জন্য এই যে কথিত অভিনব ডায়ালগ সামনে আনেন এতে কিন্তু আপনাদের পারিবারিক শিক্ষাটা কি তা বাইরে বেরিয়ে আসে। আপনার পরিবার আপনাকে ঠিক কি শিক্ষা দিয়েছে নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে তা বেরিয়ে আসে। আপনার পরিবারের অরিজিন কি, তারা কি নিয়াজী জিন্নাহর সমর্থক ছিলো নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থক ছিলো তা কিন্তু বাইরে বেরিয়ে আসে।

আমরা সবাই জার্মানীর নাৎসি বাহিনীর কর্মকান্ড সম্পর্কে জানি। নাৎসি অত্যাচারের সকল ঘটনা আমলে নিলে সর্বমোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে নব্বই লক্ষ থেকে এক কোটি দশ লক্ষের মত। মানে এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে নাৎসি বাহিনী হত্যা করেছিলো। আর সেই কারণে আজো নাৎসি বাহিনী অচ্ছুৎ, এখনো ধরে ধরে তাদেরকে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। নাৎসি বাহিনীর মতই বর্বর ছিলো পাক আর্মি, অথচ আমরা কেমন নির্লজ্জ জাতি যে, ৫০ বছর যেতে না যেতেই সেই গণহত্যাকারীদের পক্ষে স্লোগান ধরেছি। আজো জার্মানীতে প্রকাশ্যে নাৎসি সমর্থন যেখানে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় সেখানে মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশীদের পাকিস্তান সমর্থন কেনো অপরাধ বলে গণ্য হবেনা? কেন আইন করে এই জঘন্য, জন্ম পরিচয়হীন সমর্থকদের শাস্তির আওতায় আনা হবেনা! তাই আমরা চাই এই সমর্থকদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে।  পাকিস্তানী সমর্থকদের এই পাকিস্তান জিন্দাবাদ চিৎকার আমরা আর শুনতে চাইনা, এই বর্বর সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের পক্ষে কোন স্লোগান বা চাঁদ তারা মার্কা বেইমান পতাকা নিয়ে বাংলাদেশীদের উল্লাস আর দেখতে চাইনা। সেজন্য পাকিস্তান সমর্থনকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করে আইন চাই এবং দ্রুততার সাথে এই আইনের বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ের পাকিস্তান সমর্থকদের শাস্তি দেখতে চাই। সরকারকে বলবো, আমাদের ভাষা বুঝুন, এই সমর্থকদের আইন করে শাস্তির আওতায় আনুন।

 লেখক- -শিবলী হাসান, বাংলাদেশের একজন নাগরিক।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat