×
  • প্রকাশিত : ২০২৩-১১-০৪
  • ২৩৪ বার পঠিত
  • নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত আখাউড়া-আগরতলা ও খুলনা-মোংলা রেলপথ এবং মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টের দ্বিতীয় ইউনিটের উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ভার্চুয়ালি এই প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন করা হয়। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন শেখ হাসিনা। নয়াদিল্লি থেকে যুক্ত হন নরেন্দ্র মোদি।

ভারত সরকারের অনুদান সহায়তার অধীনে বাংলাদেশকে প্রদত্ত ভারতীয় ৩৯২ দশমিক ৫২ কোটি রুপি ব্যয়ে সম্পন্ন হয়েছে আখাউড়া-আগরতলা আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ প্রকল্প । বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ ও ত্রিপুরায় ৫ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার রেললাইনসহ এই রেল সংযোগের দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার।

আখাউড়া-আগরতলা আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ চালুর মাধ্যমে আন্তঃ সীমান্ত বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচন হল । এখন আরও কম খরচে, স্বল্প সময়ে আখাউড়া দিয়ে আগরতলা হয়ে ভারতে পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি-রপ্তানি সহজতর হলো। ঢাকা থেকে আগরতলা ও কলকাতার মধ্যে ভ্রমণের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে এই রেল সংযোগ। এই আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ এর সাথে একটি বড় সেতু এবং তিনটি ছোট সেতু সম্পৃক্ত রয়েছে। বর্তমানে, ট্রেনে আগরতলা থেকে কলকাতা পৌঁছতে প্রায় ৩১ ঘন্টা সময় লাগে, যা রেল সংযোগের পর কমে দাঁড়াবে  মাত্র ১০ ঘন্টা।

এই রেলপথ নির্মাণের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যে সাতটি অঙ্গরাজ্য আছে সেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। এতে দুই দেশই লাভবান হবে।  ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া্র আখাউড়া থেকে গাজীপুরের টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরিত হওয়ার পর সরাসরি কলকাতায় ট্রেন চলাচল করতে পারবে। সম্পূর্ণ রেললাইন ডুয়েলগেজ হওয়ার পর এই রেলপথে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের বিষয়ে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

খুলনা-মোংলা বন্দর রেল লাইন প্রকল্পটি ভারত সরকারের ছাড়ের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় ৩৮৮ দশমিক ৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে।  এর মাধ্যমে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর মোংলা ব্রডগেজ রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৭৭৬.৬৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ, খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত ৬৪.৭৫ কিলোমিটার মেইন লাইন নির্মাণ, ২১.১১ কিলোমিটার লুপ লাইন, আটটি রেলওয়ে স্টেশন তৈরি, ৩১টি ছোট-বড় সেতু নির্মাণ, ১১২টি কালভার্ট, রূপসা নদীর ওপর ৭১৬.৮০ মিটার সেতু নির্মাণ, রূপসা সেতুর দুই প্রান্তে ভায়াডাক্ট (উড়ালপথ) নির্মাণ, ২০০ মিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নির্মাণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লার্সেন অ্যান্ড টার্বো। আর ট্র্যাক লিংকিং করেছে আরেক ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইরকন ইন্টারন্যাশনাল। এ রেলপথ চালুর সাথে সাথে মোংলা বন্দরের গতিশীলতা বাড়বে। আগে সড়ক ও নদীপথে এ বন্দরের পণ্য পরিবহন হতো। তখন খরচ বেশি হতো। এখন রেলপথে পণ্য পরিবহনে খরচ অনেক কমে যাবে। যার প্রভাব পড়বে পণ্য মূল্যের ওপর।  নতুন নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। ট্রানজিট সুবিধার আওতায় মোংলা বন্দর থেকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এবং নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে যে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে সেটা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে খুলনা-মোংলা রেললাইন চালুর মধ্য দিয়ে। প্রাণ পাবে মোংলা ইপিজেড। নতুন নতুন শিল্পোদ্যোক্তরা আসবে এ অঞ্চলে।

 

ভারতীয় কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং স্কিমের আওতায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণের অধীনে মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট হলো বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের রামপালে অবস্থিত একটি ১৩২০ মেগাওয়াট (২X৬৬০) সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট ।  প্রকল্পটি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছে, যা ভারতের এনটিপিসি লিমিটেড এবং বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে একটি ৫০৫০ জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি।   মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট এর প্রথম ইউনিটটি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে উভয় প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে উদ্বোধন করেন, ইতোমধ্যেই তা বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে এবং ইউনিট-২ চলতি বছরের ১ নভেম্বর উদ্বোধন করা হলো। পরিবেশগত প্রভাব কার্যকরভাবে প্রশমিত করতে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। ফ্লু গ্যাস নির্গমনের বিস্তৃত বিচ্ছুরণের জন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা চিমনি (২৭৫ মিটার) রয়েছে।

 

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত। যেটি ছিল দিল্লির 'কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক'।  ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিলেও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় ভারত। এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায়সহ প্রবাসী সরকারকে যাবতীয় সহায়তা প্রদান করে।  ৬ ডিসেম্বর ভারতের স্বীকৃতি দানের পর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে দ্রুতই পাকিস্তান পরাজিত হয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এজন্যই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ।

 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ 'মৈত্রী চুক্তি'র মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের গোড়াপত্তন শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় বাণিজ্য চুক্তি ও '৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি।  ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ -ভারতের মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকসহ সব সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।  ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার আস্থা ও প্রত্যাশার আবহ তৈরি হয়। চুক্তি হয় ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি চুক্তি। আবার মাঝে নয় বছরের ছন্দপতন।  ২০০৯ সালে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ৬৮ বছরের পুরোনো ছিটমহল বিনিময়, সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলো একে একে সমাধান হতে শুরু করে।

লেখক- হাসান ইবনে হামিদ

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
ক্যালেন্ডার...

Sun
Mon
Tue
Wed
Thu
Fri
Sat